এম.এ আরিফ চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার:
সমাজে যখনই সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয়, তখন প্রায়ই শোনা যায়—‘সাংবাদিকদের এমন হওয়া উচিত’, ‘তেমন করা উচিত’, ‘বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে হবে’, ‘সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে’। এসব প্রত্যাশা অবশ্যই যৌক্তিক এবং একটি সুস্থ গণমাধ্যম ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়—যে মানুষটির কাছ থেকে সমাজ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সততা এবং সাহসিকতা প্রত্যাশা করছে, তার ন্যায্য পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আমরা কতটা সচেতন?
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত অনেক সাংবাদিক নিয়মিত ও সম্মানজনক বেতন পান না। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অসংখ্য সাংবাদিক অত্যন্ত সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। কেউ কেউ মাসের পর মাস বেতন ছাড়াই কাজ করেন, আবার অনেকের পারিশ্রমিক জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহের জন্যও যথেষ্ট নয়। তবুও তারা সংবাদ সংগ্রহ, জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরা এবং নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল সংবাদ লেখা নয়। তথ্য যাচাই, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়া, বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনি ও নৈতিক বিষয় বিবেচনা, কখনো কখনো জীবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে সত্য উদ্ঘাটন—সবই এই পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ এই শ্রম ও ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
সাংবাদিকদের কাছ থেকে পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের জন্য ন্যায্য বেতন, সময়মতো পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা একজন কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের পেশাগত সেবা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু সাংবাদিকদের দায়িত্বের কথা বললেই চলবে না; সংবাদকর্মীদের অধিকার নিয়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম গড়ে ওঠে তখনই, যখন সেখানে কর্মরত সাংবাদিকরা আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা লাভ করেন।
সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হওয়া উচিত গঠনমূলক। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, সম্মানজনক পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা এবং পেশাগত কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবিও সমানভাবে উচ্চারিত হওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, একজন সাংবাদিকও একজন শ্রমজীবী পেশাজীবী। তারও পরিবার আছে, জীবনযাত্রার ব্যয় আছে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। তাই শুধু দায়িত্বের কথা নয়—সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন ও মর্যাদার বিষয়টিও জাতীয় আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সচেতন সমাজ গঠনে স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতার বিকল্প নেই, আর সেই সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো ন্যায্য মূল্যায়ন ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 

























