সিটিজেন নিউজ ডেস্ক: মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, বন্ধু ও পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে বেশির ভাগ মানুষের। কিন্তু জীবনের নানা পরিস্থিতিতে কখনো কখনো একা হয়ে পড়তে হয়। সম্পর্কের বিচ্ছেদ, প্রিয়জনের মৃত্যু, উচ্চশিক্ষা কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে থাকা—বিভিন্ন কারণে তৈরি হতে পারে একাকীত্ব। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে হতাশা, মন খারাপ কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়ার প্রবণতা।
কখনো কখনো নিজের কষ্টগুলো শেয়ার করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না, আবার ইচ্ছেও করে না কারো সঙ্গে কথা বলতে। বর্তমান যান্ত্রিক যুগে অনেকেই এই নীরব মানসিক সংকটে ভুগছেন। কর্মক্ষেত্রের প্রচণ্ড চাপ, পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন কিংবা আকস্মিক জীবনবদলের ধাক্কায় এমন অনুভূতি তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আধুনিক সমাজ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও আত্মকেন্দ্রিক। তাই বিপদে সবসময় কেউ না কেউ পাশে থাকবেই, এমন আশা করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। বরং এই একাকীত্বকে জীবনের নেতিবাচক দিক হিসেবে না দেখে নিজের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট বা শক্তির উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে ছোট কিছু চমৎকার অভ্যাস গড়ে তুলে নিজের একাকীত্বকে উপভোগ্য ‘মি টাইম’ বা নিজস্ব সময়ে পরিণত করা সম্ভব। মানসিক বিশেষজ্ঞরা এই একাকীত্ব কাটিয়ে উঠতে কিছু চমৎকার ও কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন।
১. নিয়মিত নিজের সঙ্গে কথা বলুন
নিজের সঙ্গে প্রতিদিন কিছুটা সময় খোলামেলা কথা বলুন। সব সময় যে গভীর বা ভারী কোনো আলোচনা হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। সাধারণ কথাবার্তার মাধ্যমেই নিজেই নিজের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে উঠুন।
২. পছন্দের কাজকে সিরিয়াসলি নিন
বই পড়া, গান শোনা, ছবি আঁকা, বাগান করা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম করা—যে কাজেই আপনার সত্যিকারের আনন্দ পায়, তা আরও বেশি বেশি করার চেষ্টা করুন। কর্মব্যস্ত সময়ের বাইরে এই ভালোলাগার বিষয়টিকে প্রায় দ্বিতীয় কোনো পেশার মতো গুরুত্ব দিতে শুরু করুন।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ছবি আঁকতে ভালোবাসেন, তবে চেষ্টা করুন আরও নতুন ও জটিল ধরনের ছবি ফুটিয়ে তুলতে। কেউ যদি দৌড়াতে ভালোবাসেন, তবে ম্যারাথনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে পারেন এবং বড় কোনো ম্যারাথন ইভেন্টে নাম নিবন্ধন করতে পারেন। বর্তমান যুগের ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী থেকে শুরু করে অ্যাথলিট, সবারই নানা ধরনের টিউটোরিয়াল ভিডিও সহজেই পাওয়া যায়।
৩. শরীরচর্চা করুন
নিয়মিত নিয়ম করে হাঁটতে বেরোন বা হালকা ধরনের ব্যায়াম করুন। নিয়মিত শরীরচর্চা মন প্রফুল্ল রাখতে এবং দৈনন্দিন কাজের স্পৃহা ও উৎসাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে দারুণ সাহায্য করতে পারে।
৪. নতুন কিছু শিখুন
রান্না করা, নতুন কোনো বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করা কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখার চেষ্টা করতে পারেন। যারা ফিটনেস নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন, তারা দৈনন্দিন রুটিনে হ্যান্ডস্ট্যান্ড বা মাসেল আপের মতো কিছুটা কঠিন কিছু শেখার চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন।
৫. ঘরের বাইরে বের হন
সুযোগ পেলেই কাজের ফাঁকে কাছাকাছি কোথাও হেঁটে আসুন। যদি বাইক কিংবা গাড়ি থাকে, তবে সামান্য সময়ের জন্য হলেও একটু রাইডে বেরিয়ে পড়ুন। মাত্র এক ঘণ্টার জন্য হলেও এই পরিবর্তন মানসিক প্রশান্তি দেবে।
৬. সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমান
অন্যের সাজানো গোছানো জীবনের ছবি দেখে নিজের বাস্তব জীবনকে কখনোই ছোট ভাববেন না। অনলাইনে মানুষ সাধারণত তাদের জীবনের কেবল সেরা মুহূর্তটুকুই সবার সামনে তুলে ধরে। ছবি কিংবা ভিডিওতে কারও জীবন যতোটা সুন্দর বা নিখুঁত লাগে, বাস্তবে তা সবসময় এক থাকে না।
৭. ঘুমের নিয়ম ঠিক রাখুন
প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে ঘুমাতে যান এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। ঘুমের অনিয়ম সরাসরি মানুষের মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পৃথিবী উল্টে গেলেও প্রতিদিনের ৮ ঘণ্টার ঘুম কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। ঘুমকে জীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়ে ফেলুন।
৮. ছোট ছোট টার্গেট সেট করুন
জীবনের নানা সমস্যার ওপর আপনার মনোযোগ বেশি কেন থাকে জানেন কি? কারণ আপনার বর্তমান জীবনে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের অভাব রয়েছে। নিজের পেশাগত জীবন হোক কিংবা পছন্দের শখ, সেখানে নিজের জন্য নিয়মিত ছোট ছোট টার্গেট সেট করুন। নিজের স্কিল বা দক্ষতা বাড়ান। সবসময় যে সেখান থেকে আর্থিক আয় করতেই হবে, এমন কোনো মানে নেই। কিন্তু আমাদের মানব মস্তিষ্ক বড় বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে ভালোবাসে। তাকে সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জয়ের আনন্দ দিন।
৯. অন্যের পাশে দাঁড়ান
বিনা স্বার্থে কাউকে সাহায্য করুন অথবা কোনো সামাজিক স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুন। অসহায় পথচারী কিংবা রাস্তার অবলা প্রাণী ও কুকুর-বিড়ালের নিয়মিত দেখভাল করুন, তাদের খাবার দিন।
১০. প্রয়োজন হলে সাহায্য চান
একাকীত্ব যদি দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে এবং তা আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করুন। মনে রাখবেন, বিপদে পড়ে অন্যের সাহায্য চাওয়া কখনোই কোনো দুর্বলতা নয়।
মনে রাখবেন, একাকীত্ব কাটিয়ে ওঠার জন্য কোনো জাদুকরী বা তাৎক্ষণিক উপায় নেই। ধীরে ধীরে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো বদলান। নিজেকে নানা সৃষ্টিশীল কাজে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সবসময় ব্যস্ত রাখুন।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 


















