কাঠের চাকা ঘুরছে, আর সেই ঘূর্ণনের তালে তালে মৃৎশিল্পীর পরম মমতায় আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় রূপ নিচ্ছে একদলা কাদা-মাটি। চোখের পলকে তৈরি হয়ে যাচ্ছে নিখুঁত এক কলসি, পাতিল কিংবা সানকি। প্রখর রোদে উঠোন জুড়ে সারি সারি সাজানো লালচে-বাদামি হাঁড়ি-পাতিল, আর বাতাস জুড়ে কাঁচা মাটির এক অদ্ভুত মায়াবী সুবাস। এটি কেবল কোনো কর্মব্যস্ততার দৃশ্য নয়; এটি বাংলার আদিমতম লোকশিল্প ‘মৃৎশিল্প’-এর চিরায়ত রূপকথা।
গ্রামবাংলার এক আদিম ও নিখাদ লোকঐতিহ্যের অনন্য স্মারক মৃৎশিল্প শত শত বছর ধরে বাঙালির জীবনযাত্রা, নন্দনতত্ত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক প্লাস্টিক, মেলামাইন আর অ্যালুমিনিয়ামের কৃত্রিম চাকচিক্য যখন বাঙালির রান্নাঘর কিংবা অন্দরমহল দখল করেনি, তখন থেকেই শাশ্বত বাংলার বুকে পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র আর উৎসবের রঙ ছড়িয়ে আসছে এই মাটির শিল্প।
সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে ময়নামতি, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা প্রমাণ করে যে, এই জনপদে মৃৎশিল্পের শিকড় কতটা গভীরে। আজ প্রযুক্তির আগ্রাসনে কুমারপাড়ার সেই চেনা চাকার গতিতে কিছুটা ভাটার টান পড়লেও, মেঠোপথের ধুলো আর বৈশাখ মেলার মাটির পুতুলে আজও কান পাতলে শোনা যায় আমাদের শেকড়ের সেই আদি ও অম্লান স্পন্দন।
নামকরণ ও শিকড়ের সন্ধান
‘মৃৎ’ শব্দের অর্থ মাটি আর ‘শিল্প’ মানে সুনিপুণ সৃষ্টি; কাদা-মাটিকে মানুষের কল্যাণে সুন্দর রূপ দেওয়াই হলো মৃৎশিল্প। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে কুমার বা পাল সম্প্রদায় বংশপরম্পরায় এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই কৃষিনির্ভর বাংলায় মাটির পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। একসময় গ্রামীণ সমাজে প্রতিটি ভোরে কুমারপাড়ার চাকার ঘূর্ণন ও পোড়া মাটির সুবাস দিয়ে দিন শুরু হতো, যা ছিল বাঙালির যূথবদ্ধ যাপনের এক অনন্য নন্দনতত্ত্ব।
একটি সাধারণ কাদা-মাটির তাল কীভাবে দৃষ্টিনন্দন পাত্রে পরিণত হয়, তা দেখার মতো এক বিস্ময়। এই প্রক্রিয়ায় কয়েকটি মূল ধাপ রয়েছে:
মাটি নির্বাচন ও ছানা: সব মাটি দিয়ে এই কাজ হয় না। প্রধানত এঁটেল ও দোআঁশ মাটি সংগ্রহ করে তা নিখুঁতভাবে ছেনে নরম ও মসৃণ করা হয়।
কুমারের চাকা: ঘূর্ণায়মান কাঠের বা সিমেন্টের চাকার ওপর মাটির তাল রেখে আঙুল ও হাতের তালুর জাদুকরী চাপে নিমেষেই কাঙ্ক্ষিত আকৃতি দেওয়া হয়।
রোদে শুকানো ও পিটাই: চাকা থেকে নামানোর পর পাত্রগুলো আংশিক শুকানো হয়। এরপর কাঠের পিটনা দিয়ে পিটিয়ে পাত্রের দেয়াল সুষম ও মজবুত করা হয়।
পোন বা চুল্লিতে পোড়ানো: শুকানো পাত্রগুলো বিশেষভাবে তৈরি বড় চুল্লি বা ‘পোন’-এ সাজিয়ে খড়, কাঠ ও ঘুঁটে দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে লালচে-টেকসই রূপ দেওয়া হয়।
নিত্যদিনের তৈজস থেকে শৌখিন আসবাবের বিচিত্র সম্ভার
বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণে মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল অপরিসীম। একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
গৃহস্থালি সামগ্রী: সানকি (মাটির থালা), হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, চাড়িপাতিল, দইয়ের ভাঁড় এবং শীতের পিঠার ছাঁচ।
লোকজ মেলা ও খেলনা: বৈশাখী মেলা কিংবা পুজো-পার্বণে শিশুদের মূল আকর্ষণ টেপা পুতুল, মাটির ব্যাংক, ঘোড়া, হাতি এবং হরেক রকমের রঙিন ফল-ফলাদির খেলনা।
স্থাপত্য ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ: প্রাচীন মন্দিরের গায়ে খচিত টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকচিত্র এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার প্রতিমা ও প্রদীপ।
মৃৎশিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। মাটির পাত্র সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং স্বাস্থ্যসম্মত। মাটির কলসির ঠাণ্ডা জল কিংবা মাটির সানকিতে পান্তা ভাতের যে স্বাদ, তা কোনো আধুনিক রেফ্রিজারেটর বা কাঁচের থালা দিতে পারে না। এটি গ্রামীণ নারীদেরও পুতুল তৈরি ও রঙের কাজে যুক্ত করে কুটির শিল্পের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছিল।
বর্তমান সংকট: প্লাস্টিকের থাবা ও অস্তিত্বের লড়াই সংকট: প্লাস্টিকের থাবা ও অস্তিত্বের লড়াই
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে মৃৎশিল্প এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি:
সস্তা বিকল্পের আগ্রাসন: প্লাস্টিক, মেলামাইন এবং অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা, হালকা ও দীর্ঘস্থায়ী পণ্যের বাজারে মাটির তৈরি তৈজসপত্র আজ প্রায় কোণঠাসা।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি: কাদা-মাটি পাওয়ার স্থান কমে যাওয়া, মাটির আকাশচুম্বী দাম এবং পোন পোড়ানোর খড়-কাঠের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় লাভ কমে গেছে।
পেশা বদল: ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় সাভারের ধামরাই, কুমিল্লার বিজয়পুর কিংবা নাটোরের ঐতিহ্যবাহী পালপাড়াগুলোর নতুন প্রজন্ম এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
তবে ধুঁকতে থাকা এই শিল্পে এখন কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে শহুরে নান্দনিকতায়।
আধুনিক অন্দরমহল সজ্জা: পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এখন আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে শহরের বাসা-বাড়ি ও রেস্তোরাঁগুলোতে মাটির ডিনার সেট, মগ, বাহারি নকশার ফুলদানি, ওয়ালম্যাট এবং ল্যাম্পশেডের ব্যবহার বাড়ছে।
সরকারি উদ্যোগ: বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বিভিন্ন এনজিও এখন কুমারদের আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এর বাণিজ্যিক আধুনিকায়ন ও বিশ্ববাজারে রপ্তানির ব্যবস্থা করা জরুরি।
মৃৎশিল্প হলো বাংলার মাটির বুক থেকে উঠে আসা এক অকৃত্রিম শিল্পকলা। আধুনিকতার ভিড়ে এর ব্যবহারিক রূপ হয়তো বদলেছে, কিন্তু কাদা-মাটির সাথে বাঙালির যে আত্মিক যোগ, তা কখনো ফুরাবে না। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির এই রঙিন অধ্যায়টিকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলের যৌথ দায়িত্ব।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 






















