দিনে হালকা গরম আর রাতে ঠান্ডা ও ভোরের কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আর এই শীতের আগমনকে কেন্দ্র করে চুয়াডাঙ্গার গ্রামে শুরু হয়েছে এক উৎসবমুখর আমেজ। শীত মৌসুমে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস আহরণ ও সুস্বাদু গুড় তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছে গাছিরা।
তাই ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে খেজুর গাছ কাটায় জড়িত গাছিরা। ধারালো দা নিয়ে তারা গাছে ওঠে শুকনো অংশ ছাঁটাই-বাছাই করে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর খেজুর গাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে রস। সারারাত গাছে বাধা মাাটির ভাড়ে ফোঁটা ফোঁটা মিষ্টি রসে ভরবে সেই হাঁড়ি। আর তা জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে ঐতিহ্যবাহী নলেন গুড় ও খাঁটি পাটালি। এ পেশার সাথে ১৪/১৫ হাজার গাছি জড়িত।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার চার উপজেলায় মাঠ ও রাস্তার দুই ধারে ২ লাখ ৭২ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এরমধ্যে জীবননগর, দামুড়হুদা, দর্শনা ও আলমডাঙ্গা এলাকায় খেজুর গাছের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে ২০ ভাগ খেজুর গাছ কাটা শেষ হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে ১০/১১ কেজি গুড় উৎপাদন করা যায়। শীতের আমেজ পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই মাঠজুড়ে দিনরাত চলছে গাছ পরিচর্যার প্রস্তুতি। বর্তমানে চলছে গাছ ঝোড়া, পরিষ্কার করার কাজ। খেজুর গাছ বেশি রয়েছে এমনস্থানে গাছিরা অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করেছেন। রস থেকে গুড় তৈরি করার জন্য জ্বালানি হিসাবে খেজুর গাছের ডাল পালা শুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
চলতি শীত মৌসুমে জেলায় ২ হাজার ৭শ’ মেট্রিক টন খেজুরের গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে ২ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন খেজুরের গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল কৃষি বিভাগের।
একই সময়ে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে আয় হয়েছিল ৭৫ কোটি টাকা।
একজন শ্রমিক প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি গাছ কাটছেন। এ কাজে দৈনিক ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা মজুরি দেয়া হচ্ছে। শীতের মৌসুমে গাছ কাটা, রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিকে কেন্দ্র করে বহু শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
দামুড়হুদার দর্শনা এলাকার গাছি রহিম খাঁ বাসস’কে বলেন, এবারও আগেভাগেই খেজুর গাছ প্রস্তুত শুরু করেছেন। শীত বাড়লে রস সংগ্রহ শুরু হবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ধুতুরহাট গ্রামের গাছি শীলন হোসেন জানান, শীতের আমেজ শুরু হতেই শ্রমিক সংকট এড়াতে আমরা আগেভাগেই গাছ প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছি। কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহের দিকেই গাছে গাছে হাড়ি পাতা শুরু করব।
চুয়াডাঙ্গা সদরের গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক আকরামুল বাসস’কে বলেন, আমি এবার ৩০টি গাছ কাটবো।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে গাছ কাটা শুরু করব বলে আশা করছি। আমাদের মাঠে অনেকে গাছ ঝোড়া বা ক্যালানো শুরু করেছেন। আর ১৫ দিন পর গাছে নলি পোতা শুরু হবে। নলি পোতার আগে আরো একবার গাছ চাষতে হবে বা ক্যালাতে হবে। এর এক সপ্তাহ পর রস সংগ্রহের জন্য হাড়ি পাতা হবে। একটি গাছ থেকে ৩ দিন রস সংগ্রহের পর ৪/৫ দিন ফেলে রাখতে হয় বা গাছ শুকাতে হয়। এরপর হালকা রেক দিয়ে চেষে ফের রস সংগ্রহ করতে হবে।
খেজুরের রস থেকে মানসম্মত ও সুস্বাদু গুড় তৈরি একটি বিশেষ শিল্প। সারারাত ধরে ফোঁটা ফোঁটা করে সংগৃহীত হয় খেজুরের রস। সকালে সেই রস চুলায় নিয়ে ঘণ্টাব্যাপী জ্বাল দেয়া হয়। রস ঘন হয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু তরল গুড় (ঝোল গুড়), দানা গুড় এবং পাটালি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক নূরুল ইসলাম বাসস’কে জানান, চুয়াডাঙ্গার খেজুরের গুড়ের সুনাম দেশজুড়ে। গুণগতমান ভালো হওয়ায় সারা দেশেই এই গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আমাদের গুড় সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে শীতের শুরুতেই গাছিরা গাছ প্রস্তুতে ব্যস্ত রয়েছে। জেলার প্রায় ২০ ভাগ গাছ ইতোমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং পর্যাপ্ত শীত পড়লে এবারও আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা যত বাড়বে, খেজুর গাছ থেকে রসের প্রবাহও তত বৃদ্ধি পাবে।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 


















