আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চার দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সিরীয় সেনাবাহিনী এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাত ১১টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় বলে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।যুদ্ধবিরতির মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি অভিযানে সহায়তা করা, যার আওতায় এসডিএফের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন আটক কেন্দ্র থেকে আইএসআইএল (আইএস) বন্দিদের স্থানান্তর করা হবে।
যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে এসডিএফ এক বিবৃতিতে জানায়, এই চুক্তি উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখবে, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করবে।
এই ঘোষণার পর সিরিয়াজুড়ে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটি চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিল। মূলত এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মতবিরোধ থেকেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
গত দুই সপ্তাহে সিরিয়ার সেনাবাহিনী আলেপ্পো শহর থেকে এসডিএফকে হটিয়ে দেয় এবং দেশটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র, জলবিদ্যুৎ বাঁধ এবং আইএস যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আটক রাখার কয়েকটি স্থাপনাও সরকারের দখলে আসে। এর মধ্যে রাক্কা প্রদেশের আল-আকতান কারাগার উল্লেখযোগ্য।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে সিরিয়ার সেনাবাহিনী এসডিএফের শেষ শক্ত ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা হঠাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি এসডিএফকে শনিবার রাত পর্যন্ত সময় দেন- হয় অস্ত্র সমর্পণ করে সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা পেশ করতে হবে, নয়তো পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হবে।
নতুন করে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোয় এসডিএফ সেই পরিকল্পনা তৈরির জন্য অতিরিক্ত সময় পেল। এসডিএফ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সর্বশেষ এই সমঝোতা হয়েছে এবং দামেস্কের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফের প্রধান মিত্র ছিল। এখন তারা সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং এসডিএফের সেনা ও বেসামরিক কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
আল জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি আইমান ওঘান্না জানান, আইএস বন্দিদের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। তার ভাষায়, উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সংঘর্ষ চলতে থাকলে আইএস বন্দিরা পালিয়ে যেতে পারে এবং সংগঠনটি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে- এ আশঙ্কা করছে ওয়াশিংটন।
তিনি আরও জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে হাসাকাহ প্রদেশের একটি কারাগার থেকে শতাধিক আইএস বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, তারা আইএস বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তরের একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৭ হাজার বন্দিকে স্থানান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
যদিও যুদ্ধবিরতি নিয়ে সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র, দুই পক্ষই আপাত স্বস্তিতে আছে। তবে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে- এই ১৫ দিনের পর কী হবে। কারণ, সংঘাতের মূল ইস্যু এখনো অমীমাংসিত। আর তা হলো এসডিএফ যোদ্ধা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করা হবে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর গত বছরের মার্চে প্রেসিডেন্ট আল-শারা এসডিএফের সঙ্গে একীভূতকরণ চুক্তিতে সই করেছিলেন। তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি, যা শেষ পর্যন্ত সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পথ তৈরি করে।