একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের শেষ ভরসাস্থল হলো আইন ও বিচার ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের এই ব্যবস্থায় যেন সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিকটিম হয়ে একজন নাগরিক যখন প্রতিকার চাইতে থানা কিংবা আদালতে শরণাপন্ন হন, তখন পদে পদে তাকে যে প্রতিষ্ঠানিক জুলুম ও সিন্ডিকেটের মুখোমুখি হতে হয়, তা শুধু নিন্দনীয় নয় বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য চরম লজ্জাজনক।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন প্রকারী সংস্থা গুলোর অগ্রাধিকার (Prioritization) এবং নৈতিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। যেখানে খুন, ধর্ষণ,মাদক সিন্ডিকেট, ডাকাতি কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো গুরুতর বিষয়গুলোর তদন্তে পুলিশের চরম উদাসীনতা ও লোকবল সংকটের অজুহাত দেখা যায়, সেখানে তুচ্ছ ঘটনা বা ব্যক্তিগত আচরণকে কেন্দ্র করে ‘বিশেষ অভিযান’ ও প্রেস ব্রিফিংয়ের মহাসমারোহ আমরা দেখতে পাই। সামাজিক ট্যাবু বা নৈতিক পুলিশিং (Moral Policing) এর নামে প্রান্তিক ব্যবহারকারীকে মিডিয়ার সামনে এনে যে ধরনের সামাজিক বিপর্যয় তৈরি করা হচ্ছে, তা কোনভাবেই সুস্থ আইন-শৃঙ্খলার লক্ষণ হতে পারে না।
অন্যদিকে, শেকড়ের মূল অপরাধী ও ডিলাররা অধরাই থেকে যাচ্ছে। এই ‘পিক এন্ড চুজ’ নীতি অপরাধ দমনের চেয়ে সস্তা বাহবা পাওয়ার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় থানার ভেতর ও আদালতের বারান্দায়। সাধারণ একটা ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও যেখানে অঘোষিত ‘টেবিল মানি’ বা চা পানির খরচের অনুমতি লাগে, সেখানে মামলা আশা করা তো দূরহ ব্যাপার। টাকা না দিলে মামলার মেরিট ঘুরিয়ে দেওয়া বা এজহারের ধারা দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট।
থানা এড়াতে মানুষ যখন আদালতের দ্বারস্থ হয় সেখানেও তদন্তের নামে পিবিআই বা থানার একই চক্রের কাছে ফাইলটি ফেরত যায়। এরপর শুরু হয় তদন্ত কর্মকর্তার তুঘলকি বাণিজ্য।
এই চক্রের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো মক্কেল বিক্রির মহোৎসব ও আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতার চরম স্খলন। একজন ভুক্তভোগী যখন সর্বোচ্চ হারিয়ে নিজের উকিলকে বিশ্বাস করেন, তখন সেই উকিলই যদি
গোপনে প্রতিপক্ষের সাথে ‘অনৈতিক অর্থনীতির সেটেলমেন্ট’ করে বসেন, শুনানির দিন ইচ্ছা করে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা হাজিরা বা মামলার অগ্রগতির ভুল তথ্য বাদীকে সরবরাহ করেন- তখন মানুষের আর যাওয়ার কোন জায়গা থাকে না।
একে আইনি পরিভাষায় পেশাগত অসদাচরণ বলা হলেও বাস্তবে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোন বিচার পাওয়া যায় না। এর ফলে সাধারণ মানুষ আজ চরম বিচারহীনতায় ভুগছে এবং আইনের প্রতি তাদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এভাবে একটি রাষ্ট্র আর কতদিন চলতে পারে? বিচার না পেয়ে মানুষ যখন বাধ্য হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় কিংবা অন্ধকার জগতের মাস্তানদের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের পথ খোঁজে, তখন সমাজে নৈরাজ্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই ঘুনে ধরা আইনি ও পুলিশি কাঠামো সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সবার আগে মামলার তদন্ত সংস্থাকে প্রচলিত বাহিনী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তদন্তে কোনো টেবিল মানি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকে। দ্বিতীয়ত, মামলার ফাইলিং হাজিরা, এবং শুনানীর তারিখ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও ট্র্যাকিং সফটওয়্যারের আওতায় আনতে হবে, যেন কোন মধ্যস্বত্বভোগী বা উকিল তথ্য লুকিয়ে মক্কেলকে ঠকাতে না পারে। এবং সবশেষে, বার কাউন্সিলেকে সক্রিয় হয়ে মক্কেলের সাথে প্রতারণাকারী আইনজীবীদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করার মতো কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
আইন যেন কেবল ধনীদের সুরক্ষাকবজ আর গরিবের জন্য শোষণের হাতিয়ার না হয়। দেশের সাধারণ নাগরিকদের রক্ত পানি করা করের টাকায় চলা এই ব্যবস্থার অমূল পরিবর্তন না হলে আইনের শাসন কথাটি কেবল কেতাবি স্লোগান হিসেবেই রয়ে যাবে, যার বাস্তব অস্তিত্ব এদেশের মাটিতে কখনোই মিলবে না।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 




















