ঢাকা ০৫:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ধানগড়া বাজারে নতুন সংযোজন, ‘ধানগড়া স্পোর্টস জোন’-এর শুভ উদ্বোধন নওগাঁর মহাদেবপুরে ৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা ছিনতাই, রাতেই উদ্ধার ৯ লাখ ৩ হাজার টাকা, গ্রে/প্তার ৩ লক্ষ্মীপুরে বেদে পল্লীতে আগুনে পুড়ে গেছে বসতঘর কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা আয়োজনের নির্দেশ ঝিনাইদহে সচেতনতামূলক পুষ্টি মেলা প্রতিদিন যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায় অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে যে ৫টি প্রত্যাশা থেকে দাম্পত্যে দূরত্ব বাড়ে নর্থ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেট আসন ছিনিয়ে নিলেন ডেমোক্র্যাট কুপার সিরাজগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন জ্বালানি অনুসন্ধানে ব্রুনাইকে বিনিয়োগের আহ্বান বাংলাদেশের

প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট পেয়েছি : উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খান

 সাধারণ ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমিয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় এবং সারের অপচয় হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খানের উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া।

দীর্ঘ গবেষণা, পেটেন্ট পেতে বারবার চেষ্টা এবং বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে তার এই উদ্ভাবন পেয়েছে মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উৎসাহ ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ এ স্বীকৃতি অর্জনের পথ সুগম করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ন্যানো প্রযুক্তি ও কৃষিতে এর প্রয়োগ নিয়ে জাপানে পড়াশোনার সময়ই অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খানের মনে হয়েছিল, কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে এই প্রযুক্তির। সেই ভাবনা থেকেই দেশে ফিরে ২০১৩ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন দেশের প্রথম ন্যানো ল্যাব। সেখানে গবেষণার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে উদ্ভাবন করেন ন্যানো ইউরিয়া।

সম্প্রতি বাসসের যশোর জেলা সংবাদদাতা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর গবেষণা, উদ্ভাবনের বৈশিষ্ট্য, কৃষিতে এর সম্ভাব্য সুফল এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

বাসস : সাধারণ ইউরিয়া সার থাকতে ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেলেন কোথা থেকে?

ড. জাভেদ : সাধারণ ইউরিয়া সারের বড় সমস্যা হলো, প্রয়োগ করা সারের একটি বড় অংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে না। এই অংশের কিছু মাটিতে জমে থাকে, কিছু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়, আর কিছু বাতাসে মিশে যায়। ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে সারের কণার আকার এত ছোট করা যায় যে অল্প পরিমাণ প্রয়োগ করেই গাছকে এর প্রায় পুরোটাই গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া সম্ভব। এই চিন্তা থেকেই ২০১৮ সালে ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ শুরু করি।

বাসস : গবেষণা শুরু থেকে পেটেন্ট পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছরের যাত্রা কেমন ছিল?

ড. জাভেদ : ২০১৮ সালে গবেষণা শুরু করি এবং ২০১৯ সালে পেটেন্টের জন্য প্রথম আবেদন করি। ২০২১ সালের শুরুতে সেই আবেদন বাতিল হয়ে যায়। তারপরও হাল ছাড়িনি। আবার আবেদন করি। এরপর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিন-চার মাস আগে পেটেন্টের জন্য সরকারের কাছে আবার আবেদন করি। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ স্যার আমাকে ডেকে জানতে চান, ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট হচ্ছে না কেন, এটি বাজারে আসছে না কেন এবং কী কী সমস্যা রয়েছে।

তার উৎসাহেই গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে অংশ নিই। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ করছেন, তা আমি জানি। এটি চমৎকার কাজ করে, খরচ কম হয় এবং কৃষকের সাশ্রয় হবে।’

এরপর তিনি বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ স্যারকে দেন। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই পেটেন্ট পেয়েছি। আমাদের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

বাসস : প্রচলিত ইউরিয়া সারের তুলনায় ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মূল কারিগরি পার্থক্য ও সুবিধাগুলো কী?

ড. জাভেদ : সাধারণ ইউরিয়া দানাদার, আর আমাদের ন্যানো ইউরিয়া তরল; এর কণার আকার অত্যন্ত ছোট। কণা ছোট হওয়ায় অল্প পরিমাণ প্রয়োগে গাছ বেশি কার্যকরভাবে নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। এতে সারের অপচয় কমে। আমাদের ফর্মুলেশনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর স্থিতিশীলতা। এটি প্রায় দুই বছর পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে। ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদনে আমরা কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করি না।

বাসস : দেশের ফসলি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির যে ক্ষতি হয়, তা রোধে ন্যানো ইউরিয়া কীভাবে ভূমিকা রাখবে?

ড. জাভেদ : অতিরিক্ত ইউরিয়া মাটির অম্লতা বাড়ায়, উপকারী অণুজীবের সংখ্যা কমায় এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট ছড়িয়ে দেয়। ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে প্রতি বিঘা জমিতে মাত্র ৫০০ মিলিলিটার সার লাগে। এর বিপরীতে সাধারণ ইউরিয়া লাগে ৫০ কেজি। তাই মাটি ও পানির ওপর রাসায়নিকের চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে মাটির স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে আমরা আরও মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে যাব।

বাসস : ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ফসলের গুণগত মান বা পুষ্টিমানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে কি?

ড. জাভেদ : আমাদের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সাধারণ দানাদার ইউরিয়ার তুলনায় প্রায় সমান ফলন পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধানের ফলন দুই থেকে আট শতাংশ বেশি পেয়েছি। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখেছি, পুষ্টিমান ও ক্লোরোফিলের পরিমাণে কোনো অবনতি হয়নি। অর্থাৎ কম খরচে একই মানের ফসল পাওয়া সম্ভব।

বাসস : আপনার গবেষণায় দেখা গেছে, এই সার ব্যবহারে খরচ প্রায় ৮২ শতাংশ কমবে। সাধারণ কৃষকের জন্য এটি কতটা সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হবে?

ড. জাভেদ : ধান চাষে এক বিঘা জমিতে কৃষক সাধারণত ৫০ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করেন, যার দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, ন্যানো ইউরিয়া লাগে মাত্র ৫০০ মিলিলিটার, যার দাম ২৩০ টাকা। অর্থাৎ ধান চাষে সারের খরচ ৮০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। তরল সার হওয়ায় এটি পরিবহন ও সংরক্ষণ করাও সহজ। তবে এই হিসাব ধান চাষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; অন্য ফসলের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল অনুযায়ী খরচের হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

বাসস : সার আমদানিতে সরকারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এই উদ্ভাবন জাতীয় অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখতে পারে?

ড. জাভেদ : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সার আমদানিতে সরকারের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। দেশে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদন করা হলে এবং এটি দানাদার ইউরিয়ার একটি বড় অংশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। তবে সাশ্রয়ের প্রকৃত পরিমাণ নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ ও প্রচলিত ইউরিয়ার কতটা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব, তার ওপর।

বাসস : কৃষকেরা জমিতে এই সার কীভাবে প্রয়োগ করবেন? সাধারণ সারের মতো ছিটিয়ে, নাকি তরল হিসেবে স্প্রে করতে হবে? এ জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে কি?

ড. জাভেদ : এটি তরল সার, তাই সাধারণত পাতায় স্প্রে করে প্রয়োগ করতে হয়। কৃষকেরা পরিচিত স্প্রে পদ্ধতিতেই এটি ব্যবহার করতে পারবেন। বিশেষ কোনো জটিল প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তবে সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় সম্পর্কে ধারণা দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দেওয়া হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

বাসস : মানবদেহ, ফসল বা মাটির অণুজীবের জন্য ন্যানো পার্টিকলের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?

ড. জাভেদ : আমাদের ফর্মুলেশনে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি। আমরা নিজেদের পরীক্ষাগারে নিয়মিত পরীক্ষা করি। বিসিএসআইআরের পরীক্ষাতেও কোনো বিষাক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে ন্যানো পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়েই গবেষণা চলছে। তাই ব্যাপক ব্যবহারের আগে ও পরে আমরাও নিয়মিত পরীক্ষা চালিয়ে যাব।

বাসস : এ বিষয়ে কোনো বিষাক্ততা পরীক্ষা (টক্সিসিটি টেস্ট) বা পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা করা হয়েছে কি?

ড. জাভেদ : হ্যাঁ। আমরা নিয়মিত বিষাক্ততা পরীক্ষা করি। আমাদের কাছে বিসিএসআইআরের বিস্তারিত পরীক্ষার প্রতিবেদন রয়েছে, সেখানে কোনো বিষাক্ততা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া নিজেদের পরীক্ষাগারেও নিয়মিত পরীক্ষা করি এবং কোনো ক্ষতিকর উপাদান পাইনি।

বাসস : মাঠপর্যায়ে এই সার ব্যবহারের পর কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন কি?

ড. জাভেদ : হ্যাঁ, কৃষকেরা সন্তুষ্ট। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অনেক কৃষক ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়েছেন। বর্তমানে সারের সংকটের সময়ে কৃষকেরা বিকল্প খুঁজছেন। ন্যানো ইউরিয়া কবে বাজারে আসবে, সে বিষয়েও তাঁদের আগ্রহ রয়েছে।

বাসস : বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য ন্যানো ইউরিয়া কি প্রস্তুত?

ড. জাভেদ : আমাদের একটি ছোট পাইলট প্ল্যান্ট ইতিমধ্যে রয়েছে। বাণিজ্যিক প্ল্যান্টের পূর্ণাঙ্গ নকশাও তৈরি করেছি। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগ্রহী হলে আমরা উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রস্তুত।

বাসস : দেশের শিল্প খাত বা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সঙ্গে বড় পরিসরে উৎপাদনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি?

ড. জাভেদ : শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা কয়েকবার আলোচনা করেছি। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, বিসিআইসি তাদের বিদ্যমান কারখানা ও সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেই ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারে। তাদের একটি দল আমাদের ল্যাব পরিদর্শন করেছে এবং প্রস্তাব চেয়েছে। আমরা বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এখনো তাদের সাড়ার অপেক্ষায় আছি।

এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে আমরা আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

বাসস : ভারতের ইফকো (আইএফএফসিও) ইতিমধ্যে তরল ন্যানো ইউরিয়া বাজারজাত করেছে। আপনার উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়ার সঙ্গে তাদের পণ্যের কোনো প্রযুক্তিগত পার্থক্য রয়েছে কি?

ড. জাভেদ : আমরা ২০১৮ সালে কাজ শুরু করি এবং ২০১৯ সালে পেটেন্টের জন্য প্রথম আবেদন জমা দিই। ভারত ২০২১ সালে তাদের পণ্য বাজারে আনে। আমাদের ফর্মুলেশনে কণার আকার অত্যন্ত ছোট, এর স্থিতিশীলতা প্রায় দুই বছর এবং উৎপাদনে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের পেটেন্টে বর্ণিত হয়েছে। আমরা স্বাধীনভাবে ও মৌলিক উপায়ে এই কাজ করেছি। ২০১৯ সালের আবেদনই তার দলিল।

বাসস : এই উদ্ভাবনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে—যেমন বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) বা অন্য কোনো দেশে—পেটেন্ট নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি?

ড. জাভেদ : আন্তর্জাতিক পেটেন্টের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যয় ও সময় বড় বিষয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে আমরা এগিয়ে যাব।

বাসস : দেশের চাহিদা মেটানোর পর ভবিষ্যতে এই ন্যানো ইউরিয়া বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা দেখছেন কি?

ড. জাভেদ : প্রথমে দেশের চাহিদা মেটানোই আমাদের লক্ষ্য। এরপর গুণমান নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে কৃষিপ্রধান এশীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোতে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে, নিশ্চিত কোনো পরিকল্পনা নয়।

বাসস : দীর্ঘ গবেষণা ও পেটেন্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) এবং সরকারের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন?

ড. জাভেদ : যবিপ্রবি আমাকে পরীক্ষাগার ও গবেষণার পরিবেশ দিয়েছে। পেটেন্ট পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর উদ্যোগ ও সহযোগিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।

বাসস : যবিপ্রবির ন্যানো টেকনোলজি গবেষণাগার থেকে ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে আর কী কী নতুন উদ্ভাবনের কাজ চলছে?

ড. জাভেদ : আমরা বিশ্বব্যাংক-ইউজিসির প্রকল্পের আওতায় ন্যানো পেস্টিসাইড নিয়ে কাজ করছি। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাছ থেকেও ন্যানো প্রযুক্তিভিত্তিক সড়ক নির্মাণ নিয়ে কাজের একটি প্রস্তাব পেয়েছি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করাই আমাদের লক্ষ্য।

বাসস : বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা, যাঁরা পরীক্ষাগারের সুযোগ-সুবিধা বা অর্থায়নের অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ড. জাভেদ : আমি তাঁদের ধৈর্য ধরতে বলব। আমার প্রথম আবেদন বাতিল হয়েছিল, তবু আমি থেমে যাইনি। পরীক্ষাগার ও অর্থায়নের অভাবে হতাশ না হয়ে প্রথমে সমস্যাটি চিহ্নিত করতে হবে। ছোট পরিসর থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। গবেষণার তারিখ, উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হবে। পেটেন্টের ক্ষেত্রে এগুলো খুবই জরুরি। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদার খুঁজে নিতে হবে।


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ধানগড়া বাজারে নতুন সংযোজন, ‘ধানগড়া স্পোর্টস জোন’-এর শুভ উদ্বোধন

প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট পেয়েছি : উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খান

আপডেট টাইম : ১২:১০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

 সাধারণ ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমিয়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় এবং সারের অপচয় হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খানের উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া।

দীর্ঘ গবেষণা, পেটেন্ট পেতে বারবার চেষ্টা এবং বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে তার এই উদ্ভাবন পেয়েছে মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উৎসাহ ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ এ স্বীকৃতি অর্জনের পথ সুগম করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ন্যানো প্রযুক্তি ও কৃষিতে এর প্রয়োগ নিয়ে জাপানে পড়াশোনার সময়ই অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খানের মনে হয়েছিল, কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে এই প্রযুক্তির। সেই ভাবনা থেকেই দেশে ফিরে ২০১৩ সালে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন দেশের প্রথম ন্যানো ল্যাব। সেখানে গবেষণার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে উদ্ভাবন করেন ন্যানো ইউরিয়া।

সম্প্রতি বাসসের যশোর জেলা সংবাদদাতা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর গবেষণা, উদ্ভাবনের বৈশিষ্ট্য, কৃষিতে এর সম্ভাব্য সুফল এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

বাসস : সাধারণ ইউরিয়া সার থাকতে ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেলেন কোথা থেকে?

ড. জাভেদ : সাধারণ ইউরিয়া সারের বড় সমস্যা হলো, প্রয়োগ করা সারের একটি বড় অংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে না। এই অংশের কিছু মাটিতে জমে থাকে, কিছু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়, আর কিছু বাতাসে মিশে যায়। ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে সারের কণার আকার এত ছোট করা যায় যে অল্প পরিমাণ প্রয়োগ করেই গাছকে এর প্রায় পুরোটাই গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া সম্ভব। এই চিন্তা থেকেই ২০১৮ সালে ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ শুরু করি।

বাসস : গবেষণা শুরু থেকে পেটেন্ট পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছরের যাত্রা কেমন ছিল?

ড. জাভেদ : ২০১৮ সালে গবেষণা শুরু করি এবং ২০১৯ সালে পেটেন্টের জন্য প্রথম আবেদন করি। ২০২১ সালের শুরুতে সেই আবেদন বাতিল হয়ে যায়। তারপরও হাল ছাড়িনি। আবার আবেদন করি। এরপর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিন-চার মাস আগে পেটেন্টের জন্য সরকারের কাছে আবার আবেদন করি। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ স্যার আমাকে ডেকে জানতে চান, ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট হচ্ছে না কেন, এটি বাজারে আসছে না কেন এবং কী কী সমস্যা রয়েছে।

তার উৎসাহেই গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে অংশ নিই। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ন্যানো ইউরিয়া নিয়ে কাজ করছেন, তা আমি জানি। এটি চমৎকার কাজ করে, খরচ কম হয় এবং কৃষকের সাশ্রয় হবে।’

এরপর তিনি বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ স্যারকে দেন। প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই পেটেন্ট পেয়েছি। আমাদের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

বাসস : প্রচলিত ইউরিয়া সারের তুলনায় ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মূল কারিগরি পার্থক্য ও সুবিধাগুলো কী?

ড. জাভেদ : সাধারণ ইউরিয়া দানাদার, আর আমাদের ন্যানো ইউরিয়া তরল; এর কণার আকার অত্যন্ত ছোট। কণা ছোট হওয়ায় অল্প পরিমাণ প্রয়োগে গাছ বেশি কার্যকরভাবে নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে। এতে সারের অপচয় কমে। আমাদের ফর্মুলেশনের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর স্থিতিশীলতা। এটি প্রায় দুই বছর পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে। ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদনে আমরা কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করি না।

বাসস : দেশের ফসলি জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির যে ক্ষতি হয়, তা রোধে ন্যানো ইউরিয়া কীভাবে ভূমিকা রাখবে?

ড. জাভেদ : অতিরিক্ত ইউরিয়া মাটির অম্লতা বাড়ায়, উপকারী অণুজীবের সংখ্যা কমায় এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট ছড়িয়ে দেয়। ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে প্রতি বিঘা জমিতে মাত্র ৫০০ মিলিলিটার সার লাগে। এর বিপরীতে সাধারণ ইউরিয়া লাগে ৫০ কেজি। তাই মাটি ও পানির ওপর রাসায়নিকের চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে মাটির স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে আমরা আরও মাঠপর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে যাব।

বাসস : ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ফসলের গুণগত মান বা পুষ্টিমানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে কি?

ড. জাভেদ : আমাদের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সাধারণ দানাদার ইউরিয়ার তুলনায় প্রায় সমান ফলন পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ধানের ফলন দুই থেকে আট শতাংশ বেশি পেয়েছি। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখেছি, পুষ্টিমান ও ক্লোরোফিলের পরিমাণে কোনো অবনতি হয়নি। অর্থাৎ কম খরচে একই মানের ফসল পাওয়া সম্ভব।

বাসস : আপনার গবেষণায় দেখা গেছে, এই সার ব্যবহারে খরচ প্রায় ৮২ শতাংশ কমবে। সাধারণ কৃষকের জন্য এটি কতটা সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হবে?

ড. জাভেদ : ধান চাষে এক বিঘা জমিতে কৃষক সাধারণত ৫০ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করেন, যার দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে, ন্যানো ইউরিয়া লাগে মাত্র ৫০০ মিলিলিটার, যার দাম ২৩০ টাকা। অর্থাৎ ধান চাষে সারের খরচ ৮০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। তরল সার হওয়ায় এটি পরিবহন ও সংরক্ষণ করাও সহজ। তবে এই হিসাব ধান চাষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; অন্য ফসলের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল অনুযায়ী খরচের হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

বাসস : সার আমদানিতে সরকারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এই উদ্ভাবন জাতীয় অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখতে পারে?

ড. জাভেদ : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সার আমদানিতে সরকারের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। দেশে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদন করা হলে এবং এটি দানাদার ইউরিয়ার একটি বড় অংশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। তবে সাশ্রয়ের প্রকৃত পরিমাণ নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ ও প্রচলিত ইউরিয়ার কতটা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব, তার ওপর।

বাসস : কৃষকেরা জমিতে এই সার কীভাবে প্রয়োগ করবেন? সাধারণ সারের মতো ছিটিয়ে, নাকি তরল হিসেবে স্প্রে করতে হবে? এ জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে কি?

ড. জাভেদ : এটি তরল সার, তাই সাধারণত পাতায় স্প্রে করে প্রয়োগ করতে হয়। কৃষকেরা পরিচিত স্প্রে পদ্ধতিতেই এটি ব্যবহার করতে পারবেন। বিশেষ কোনো জটিল প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তবে সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগের সময় সম্পর্কে ধারণা দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দেওয়া হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

বাসস : মানবদেহ, ফসল বা মাটির অণুজীবের জন্য ন্যানো পার্টিকলের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?

ড. জাভেদ : আমাদের ফর্মুলেশনে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি। আমরা নিজেদের পরীক্ষাগারে নিয়মিত পরীক্ষা করি। বিসিএসআইআরের পরীক্ষাতেও কোনো বিষাক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে ন্যানো পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়েই গবেষণা চলছে। তাই ব্যাপক ব্যবহারের আগে ও পরে আমরাও নিয়মিত পরীক্ষা চালিয়ে যাব।

বাসস : এ বিষয়ে কোনো বিষাক্ততা পরীক্ষা (টক্সিসিটি টেস্ট) বা পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা করা হয়েছে কি?

ড. জাভেদ : হ্যাঁ। আমরা নিয়মিত বিষাক্ততা পরীক্ষা করি। আমাদের কাছে বিসিএসআইআরের বিস্তারিত পরীক্ষার প্রতিবেদন রয়েছে, সেখানে কোনো বিষাক্ততা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া নিজেদের পরীক্ষাগারেও নিয়মিত পরীক্ষা করি এবং কোনো ক্ষতিকর উপাদান পাইনি।

বাসস : মাঠপর্যায়ে এই সার ব্যবহারের পর কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন কি?

ড. জাভেদ : হ্যাঁ, কৃষকেরা সন্তুষ্ট। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অনেক কৃষক ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়েছেন। বর্তমানে সারের সংকটের সময়ে কৃষকেরা বিকল্প খুঁজছেন। ন্যানো ইউরিয়া কবে বাজারে আসবে, সে বিষয়েও তাঁদের আগ্রহ রয়েছে।

বাসস : বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য ন্যানো ইউরিয়া কি প্রস্তুত?

ড. জাভেদ : আমাদের একটি ছোট পাইলট প্ল্যান্ট ইতিমধ্যে রয়েছে। বাণিজ্যিক প্ল্যান্টের পূর্ণাঙ্গ নকশাও তৈরি করেছি। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগ্রহী হলে আমরা উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রস্তুত।

বাসস : দেশের শিল্প খাত বা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সঙ্গে বড় পরিসরে উৎপাদনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি?

ড. জাভেদ : শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা কয়েকবার আলোচনা করেছি। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, বিসিআইসি তাদের বিদ্যমান কারখানা ও সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেই ন্যানো ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারে। তাদের একটি দল আমাদের ল্যাব পরিদর্শন করেছে এবং প্রস্তাব চেয়েছে। আমরা বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এখনো তাদের সাড়ার অপেক্ষায় আছি।

এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে আমরা আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

বাসস : ভারতের ইফকো (আইএফএফসিও) ইতিমধ্যে তরল ন্যানো ইউরিয়া বাজারজাত করেছে। আপনার উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়ার সঙ্গে তাদের পণ্যের কোনো প্রযুক্তিগত পার্থক্য রয়েছে কি?

ড. জাভেদ : আমরা ২০১৮ সালে কাজ শুরু করি এবং ২০১৯ সালে পেটেন্টের জন্য প্রথম আবেদন জমা দিই। ভারত ২০২১ সালে তাদের পণ্য বাজারে আনে। আমাদের ফর্মুলেশনে কণার আকার অত্যন্ত ছোট, এর স্থিতিশীলতা প্রায় দুই বছর এবং উৎপাদনে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। এসব বৈশিষ্ট্য আমাদের পেটেন্টে বর্ণিত হয়েছে। আমরা স্বাধীনভাবে ও মৌলিক উপায়ে এই কাজ করেছি। ২০১৯ সালের আবেদনই তার দলিল।

বাসস : এই উদ্ভাবনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে—যেমন বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) বা অন্য কোনো দেশে—পেটেন্ট নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি?

ড. জাভেদ : আন্তর্জাতিক পেটেন্টের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যয় ও সময় বড় বিষয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে আমরা এগিয়ে যাব।

বাসস : দেশের চাহিদা মেটানোর পর ভবিষ্যতে এই ন্যানো ইউরিয়া বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা দেখছেন কি?

ড. জাভেদ : প্রথমে দেশের চাহিদা মেটানোই আমাদের লক্ষ্য। এরপর গুণমান নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে কৃষিপ্রধান এশীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোতে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে, নিশ্চিত কোনো পরিকল্পনা নয়।

বাসস : দীর্ঘ গবেষণা ও পেটেন্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) এবং সরকারের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন?

ড. জাভেদ : যবিপ্রবি আমাকে পরীক্ষাগার ও গবেষণার পরিবেশ দিয়েছে। পেটেন্ট পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর উদ্যোগ ও সহযোগিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।

বাসস : যবিপ্রবির ন্যানো টেকনোলজি গবেষণাগার থেকে ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে আর কী কী নতুন উদ্ভাবনের কাজ চলছে?

ড. জাভেদ : আমরা বিশ্বব্যাংক-ইউজিসির প্রকল্পের আওতায় ন্যানো পেস্টিসাইড নিয়ে কাজ করছি। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাছ থেকেও ন্যানো প্রযুক্তিভিত্তিক সড়ক নির্মাণ নিয়ে কাজের একটি প্রস্তাব পেয়েছি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করাই আমাদের লক্ষ্য।

বাসস : বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা, যাঁরা পরীক্ষাগারের সুযোগ-সুবিধা বা অর্থায়নের অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ড. জাভেদ : আমি তাঁদের ধৈর্য ধরতে বলব। আমার প্রথম আবেদন বাতিল হয়েছিল, তবু আমি থেমে যাইনি। পরীক্ষাগার ও অর্থায়নের অভাবে হতাশ না হয়ে প্রথমে সমস্যাটি চিহ্নিত করতে হবে। ছোট পরিসর থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। গবেষণার তারিখ, উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র যত্ন করে সংরক্ষণ করতে হবে। পেটেন্টের ক্ষেত্রে এগুলো খুবই জরুরি। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদার খুঁজে নিতে হবে।


প্রিন্ট