দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন এখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদিত হওয়ায় পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরুর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে আগামী মাসে এ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে।
প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে শুরু করে দুটি ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা—প্রতিটি ধাপই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি এবং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বর মাসে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা সংক্রান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়।
এ অগ্রগতির ফলে চুল্লির পরবর্তী পর্যায়ের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু, চুল্লির সক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি, টারবাইন চালু এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—প্রতিটি পৃথক ধাপ। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব নিরাপত্তা পরীক্ষা ও কারিগরি কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়াই এখন প্রধান বিবেচ্য।
রূপপুরের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে এক মাস সময় লাগতে পারে। পরে ধাপে ধাপে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে।
প্রাথমিকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা চলবে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছাতে আরও সময় প্রয়োজন হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ কেন্দ্রের চুল্লিতে ব্যবহৃত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। তবে প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদা, কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ তৈরি করতে হয় না। চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ আয়ুষ্কাল আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, কেন্দ্রটির প্রতিটি ইউনিট দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনার জন্য পরিকল্পিত। তবে নির্দিষ্ট সময় পর জ্বালানি পরিবর্তন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন হবে। সাধারণ পরিচালন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ব্যবহৃত জ্বালানি অপসারণ, নতুন জ্বালানি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে একটি ইউনিট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হবে।
রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটম রূপপুরে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করলেও তখন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কাজের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে ৫০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে। এখন প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তব উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বিভিন্ন সরকারের সময়ে এগিয়েছে। বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ, সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, স্বচ্ছ ট্যারিফ ব্যবস্থা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যের কথা বিএনপি’র ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রূপপুরের ভূমিকা শুধু উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি (পাশ) উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প নয়; এটি আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ।
তিনি বলেন, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত সময়সীমার আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব বাসস’কে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির অনেক প্রচলিত সমীকরণ নতুনভাবে বিন্যস্ত হবে।
তিনি বলেন, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাসস’কে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। রূপপুরের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন সক্ষমতার দ্বার উন্মোচন করেছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ সক্ষমতা কাজে লাগানোর মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ও জ্বালানি-নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বর্তমান বিএনপি সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরলসভাবে কাজ করছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পারমাণবিক শক্তি (পাশ) উইং সরকারের পক্ষে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন রোসাটম কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 
























