রোকন বিশ্বাস-পাবনা প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত। সরকার বছরের পর বছর ধরে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও মানসম্মত করার উদ্যোগ নিয়ে আসছে। তবে বাস্তব চিত্রের সঙ্গে নীতিগত উদ্যোগের একটি ব্যবধান এখনও স্পষ্ট। পাবনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর ফলে অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
একসময় যে বিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল, বর্তমানে সেসব বিদ্যালয়ের অনেক শ্রেণিকক্ষে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী দেখা যায়। অন্যদিকে, পাশের একটি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতেও অপেক্ষা করতে হয় অভিভাবকদের।
বিভিন্ন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই কিন্ডারগার্টেনমুখী হচ্ছেন। অনেক কিন্ডারগার্টেনে নিয়মিত পাঠদান, দৈনিক ক্লাস মূল্যায়ন, বাড়ির কাজ, মাসিক পরীক্ষা, অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবিড় তদারকি থাকে। ফলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, কিছু সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও শ্রেণিকক্ষে কাঙ্ক্ষিত পাঠদান হয় না, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত মূল্যায়ন করা হয় না এবং অনেক সময় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেয়ে অন্যান্য কার্যক্রম বেশি গুরুত্ব পায়। তবে এ ধরনের অভিযোগ সব সরকারি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; জেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দক্ষ শিক্ষক ও ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কিন্ডারগার্টেনগুলোতে ইংরেজি শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিয়মিত পরীক্ষা ও বাড়ির কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়। অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় সন্তানের অগ্রগতি সহজেই জানা যায়। অনেক কিন্ডারগার্টেনে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
এসব কারণে অনেক অভিভাবক মনে করেন, সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে তাদের সন্তান বেশি যত্ন পাচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলেও বাস্তবে জেলার অনেক বিদ্যালয় ভালো ফলাফল করছে। অনেক শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করছেন এবং শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
তবে কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
অর্থাৎ, সব সরকারি বিদ্যালয়কে একই মানদণ্ডে বিচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি যেসব বিদ্যালয়ে দুর্বলতা রয়েছে সেগুলোর সমস্যাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শিক্ষাবিদরা জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত ও অননুমোদিত দুই ধরনের কিন্ডারগার্টেনই গড়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ করলেও কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কিংবা পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
তাই শুধু সরকারি বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন নয়, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা। শিক্ষকদের উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রমে কঠোর মনিটরিং জোরদার করা। আধুনিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা। ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সৃজনশীল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো। বিদ্যালয়ভিত্তিক অভিভাবক-শিক্ষক সভা নিয়মিত আয়োজন করা। অনুমোদনহীন কিন্ডারগার্টেনগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই করা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর তার প্রভাব পড়বে।
পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল কবীর জানান, আমাদের কিছু সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে, বিশেষ করে মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সব শিক্ষার্থীকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, অভিভাবকদের মধ্যেও সরকারি বিদ্যালয় সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা বা মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সামর্থ্য থাকলে সন্তানকে অবশ্যই কিন্ডারগার্টেনে পড়াতে হবে। এমনকি একটি অফিসের পিয়নের ছেলেকেও তিনি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাতে চান, এটিও এখন অনেকের কাছে এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটু খোঁজ নিলেই বোঝা যাবে, সাধারণত কোন ধরনের পরিবার তাদের সন্তানদের কোথায় পড়াচ্ছেন। আমাদের পাবনা জেলায় নয়টি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে গেলে বাস্তব চিত্র দেখা যাবে।
কিন্ডারগার্টেন এখন অনেকাংশে একটি ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে হয়। নির্ধারিত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে না পারলে অনেক সময় তাদের চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সরকার দেয়। সরকার আমাদের যে নির্দেশনা দিয়েছে, আমরা সেই নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদনের কার্যক্রম পরিচালনা করি। আগে অনুমোদনের শর্ত কঠোর ছিল, তাই অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হতো না। বর্তমানে প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় নিয়ম মেনে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে কোথায় পড়াবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যদি কিন্ডারগার্টেন না থাকত, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করে, তাদের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত শিক্ষাজীবনে টিকে থাকে। অবশ্য কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও টিকে থাকে, তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় সেই হার কিছুটা কম।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণত সেইসব পরিবারের সন্তানরা আসে, যাদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্থ ব্যয় করে পড়ানোর সামর্থ্য কম। সেখানে তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পায়। কাউকে তো আমরা বাধা দিতে পারি না। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
আমার বিশ্বাস, যখন অভিভাবকদের উপলব্ধি আরও স্পষ্ট হবে, তখন তারা আবারও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে ফিরে আসবেন। ইতোমধ্যেই কিন্ডারগার্টেন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসা শুরু হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো বিকল্প নেই।
এখন থেকে নতুন করে আর কোনো কিন্ডারগার্টেনের অনুমোদন দেওয়া হবে না। ধীরে ধীরে নিবন্ধন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাও সম্ভব হবে না।
একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একজন অভিভাবকের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আবারও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে পারে।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 
























