ঢাকা ০৮:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শারদীয় দুর্গোৎসবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করছে : রাশেদ খাঁন দেশবিরোধী চক্রান্তের কাছে জাতীয়তাবাদী শক্তি আত্মসমর্পণ করবে না : রুহুল কবির রিজভী জুলাই জাদুঘরের নথি চব্বিশের সংঘাতময় ঘটনাগুলোর সাক্ষ্য বহন করে : সুসান ভাইজ আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশোধিত ট্যারিফ অনুমোদন আইনি বিপাকে হানি সিং তরুণরাই বাংলাদেশে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার মূল শক্তি : ববি হাজ্জাজ হানিফসহ ৪ আ.লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের সীমা ও মেয়াদ বাড়ানোর দাবি ডিবিএর আসন্ন দূর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত দেশকে অস্থির করতে নানাভাবে কাজ করছে পতিত দোসররা : রিজভী

আর্থিক খাতে নিজস্ব সংস্কার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সহযোগিতা চায় সরকার

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং, রাজস্বসহ আর্থিক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে এসব সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; দেশের সমস্যাগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করে নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে  কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে আজ বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

আগামী ১২ অক্টোবর ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন। এতে অর্থ উপদেষ্টা ড. তিতুমীরের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।

তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। প্রধান তিনটি সূচক ছিল—ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রাজস্ব আয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসা এবং অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট।

তিনি বলেন, “এই তিনটি সংকট আমরা আমাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছি। অতীতে এটি আইএমএফের প্রোগ্রামের মধ্যে ছিল এবং তারা কতগুলো শর্তযুক্ত বিষয়ের মধ্যে রেখেছিল। এখন আমাদের যে অভ্যন্তরীণ কৌশলগুলো, সেগুলো নিয়েই আমরা অগ্রসর হচ্ছি।”

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রথম লক্ষ্য। পাঁচটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা একসময় নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। এখন তাদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থার পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।

ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণ ১১ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। আবার এনবিএলের মতো অনেক বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও বা এডিআরও ছিল অনেক বেশি।

ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কমাতে সরকার অভ্যন্তরীণ পদ্ধতিতে সমাধান বের করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংক পরিচালনায় সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে অর্থ ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ে ৭ শতাংশ প্রণোদনামূলক সুদে একটি উদ্ভাবনী পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিতুমীর।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ কলকারখানা চালুর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল, নারী উদ্যোক্তা ও অবহেলিত অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর আশা করছে সরকার।

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এখন স্থিতিশীল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন থাকা প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে সুদের হার কমাবে।

বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারকেও সচল করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জিডিপি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিতুমীর বলেন, “আগের আইএমএফ প্রোগ্রামগুলো সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিল। আর আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগেই ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বন্ধ কলকারখানা চালু ও ঋণ প্রবাহের সংস্কারগুলোকে চিহ্নিত করেছি। এগুলো সবই অভ্যন্তরীণ বা স্বীয় চালিত সংস্কার প্রোগ্রাম।”

রাজস্ব বাড়াতে অর্থনীতির মডেল বদলাচ্ছে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা জানান,

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা কাটাতেও সংস্কার চলছে। তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতিতে কর-জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় তলানিতে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর ফলে ৩০ জুনের মধ্যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেলেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “আমরা মডেলের পরিবর্তন আনছি : উৎপাদন → বিনিয়োগ → উৎপাদন → কর্মসংস্থান।”

এছাড়া, ৪০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের ফলে দারিদ্র্য ৫ শতাংশ কমার আশা করা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে  বিশ্বব্যাংকের দেও্য়া হিসাবের কথা উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন,  অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে তিনটি বড় সমস্যা ছিল—উপযুক্ত ব্যক্তিদের বাদ পড়ে যাওয়া, অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং কর্মসূচিগুলোর খণ্ডবিখণ্ডতা।

এই সমস্যা কাটাতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২৩ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ৪০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া গেলে দারিদ্র্য ৫ শতাংশ কমে আসবে। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।

বর্তমান মূল্যস্ফীতি আগের সরকারের সময়কার স্বজনতোষণ, অলিগার্কি বা দুর্নীতিগ্রস্ত বণ্টন ব্যবস্থার কারণে হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিতুমীর। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো বহিঃস্থ কারণ এখন মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাংক পরবর্তী সময়ে নগদ অর্থের সহায়তা দেওয়ার কথা বললেও সংস্থাটির প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সরকার ফ্যামিলি কার্ডের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশের প্রতি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়ছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যে গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য ৫০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এডিবি ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর প্রেসিডেন্ট এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (ইসডিবি) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকারীরা কাজ শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এবং বিশ্বের বৃহত্তম স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের মূল বার্তা হবে—সংস্কারগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; এগুলো দেশের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ।

“আমাদের সংস্কারগুলো বাইরের সংস্থা দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া নয়, এগুলো আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ,” বলেন তিতুমীর।

তিনি বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমস্যাগুলো দেশীয়ভাবে চিহ্নিত করা এবং বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরকারের জনগণের ম্যান্ডেট মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করা।

অর্থায়ন নিয়েও কোনো বিভ্রান্তি নেই জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের অর্থায়নের উৎস হবে বহুমুখী। শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে কনসেশনাল ও নন-কনসেশনাল ঋণের পাশাপাশি স্থানীয় বন্ড, সুকুক বন্ড এবং ওয়েজ আর্নার স্কিমের মতো বিভিন্ন উৎস কাজে লাগানো হবে। তিনি বলেন, “আমাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য আনা হবে।”


প্রিন্ট
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

শারদীয় দুর্গোৎসবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করছে : রাশেদ খাঁন

আর্থিক খাতে নিজস্ব সংস্কার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সহযোগিতা চায় সরকার

আপডেট টাইম : ০৬:২০:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যাংকিং, রাজস্বসহ আর্থিক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে এসব সংস্কার কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; দেশের সমস্যাগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করে নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে  কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে আজ বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

আগামী ১২ অক্টোবর ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন। এতে অর্থ উপদেষ্টা ড. তিতুমীরের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।

তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। প্রধান তিনটি সূচক ছিল—ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রাজস্ব আয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসা এবং অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট।

তিনি বলেন, “এই তিনটি সংকট আমরা আমাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছি। অতীতে এটি আইএমএফের প্রোগ্রামের মধ্যে ছিল এবং তারা কতগুলো শর্তযুক্ত বিষয়ের মধ্যে রেখেছিল। এখন আমাদের যে অভ্যন্তরীণ কৌশলগুলো, সেগুলো নিয়েই আমরা অগ্রসর হচ্ছি।”

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রথম লক্ষ্য। পাঁচটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা একসময় নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। এখন তাদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থার পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে।

ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণ ১১ শতাংশ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। আবার এনবিএলের মতো অনেক বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও বা এডিআরও ছিল অনেক বেশি।

ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কমাতে সরকার অভ্যন্তরীণ পদ্ধতিতে সমাধান বের করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে রাজনৈতিকভাবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাংক পরিচালনায় সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে অর্থ ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ে ৭ শতাংশ প্রণোদনামূলক সুদে একটি উদ্ভাবনী পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিতুমীর।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ কলকারখানা চালুর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল, নারী উদ্যোক্তা ও অবহেলিত অঞ্চলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর আশা করছে সরকার।

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এখন স্থিতিশীল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন থাকা প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধীরে ধীরে সুদের হার কমাবে।

বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারকেও সচল করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জিডিপি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে।

তিতুমীর বলেন, “আগের আইএমএফ প্রোগ্রামগুলো সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিল। আর আমরা দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগেই ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বন্ধ কলকারখানা চালু ও ঋণ প্রবাহের সংস্কারগুলোকে চিহ্নিত করেছি। এগুলো সবই অভ্যন্তরীণ বা স্বীয় চালিত সংস্কার প্রোগ্রাম।”

রাজস্ব বাড়াতে অর্থনীতির মডেল বদলাচ্ছে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা জানান,

রাজস্ব খাতের দুর্বলতা কাটাতেও সংস্কার চলছে। তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনীতিতে কর-জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় তলানিতে ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিষয়ক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর ফলে ৩০ জুনের মধ্যে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেলেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “আমরা মডেলের পরিবর্তন আনছি : উৎপাদন → বিনিয়োগ → উৎপাদন → কর্মসংস্থান।”

এছাড়া, ৪০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের ফলে দারিদ্র্য ৫ শতাংশ কমার আশা করা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে  বিশ্বব্যাংকের দেও্য়া হিসাবের কথা উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন,  অতীতের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে তিনটি বড় সমস্যা ছিল—উপযুক্ত ব্যক্তিদের বাদ পড়ে যাওয়া, অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং কর্মসূচিগুলোর খণ্ডবিখণ্ডতা।

এই সমস্যা কাটাতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২৩ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ৪০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া গেলে দারিদ্র্য ৫ শতাংশ কমে আসবে। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।

বর্তমান মূল্যস্ফীতি আগের সরকারের সময়কার স্বজনতোষণ, অলিগার্কি বা দুর্নীতিগ্রস্ত বণ্টন ব্যবস্থার কারণে হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিতুমীর। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো বহিঃস্থ কারণ এখন মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাংক পরবর্তী সময়ে নগদ অর্থের সহায়তা দেওয়ার কথা বললেও সংস্থাটির প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সরকার ফ্যামিলি কার্ডের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশের প্রতি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা বাড়ছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যে গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের জন্য ৫০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এডিবি ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর প্রেসিডেন্ট এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (ইসডিবি) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকারীরা কাজ শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এবং বিশ্বের বৃহত্তম স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের মূল বার্তা হবে—সংস্কারগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপিয়ে দেওয়া নয়; এগুলো দেশের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ।

“আমাদের সংস্কারগুলো বাইরের সংস্থা দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া নয়, এগুলো আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ,” বলেন তিতুমীর।

তিনি বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমস্যাগুলো দেশীয়ভাবে চিহ্নিত করা এবং বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরকারের জনগণের ম্যান্ডেট মিলিয়ে যৌথভাবে কাজ করা।

অর্থায়ন নিয়েও কোনো বিভ্রান্তি নেই জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের অর্থায়নের উৎস হবে বহুমুখী। শুধু বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে কনসেশনাল ও নন-কনসেশনাল ঋণের পাশাপাশি স্থানীয় বন্ড, সুকুক বন্ড এবং ওয়েজ আর্নার স্কিমের মতো বিভিন্ন উৎস কাজে লাগানো হবে। তিনি বলেন, “আমাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য আনা হবে।”


প্রিন্ট