রিপোর্টার শাফায়েত হোসেন:
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় কুমার নদে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন এক প্রবীণ জেলে। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরাই তাঁর পেশা। শৈশব থেকে এই নদীর সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনের সম্পর্ক। একসময় নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের সংকট ও অবৈধ জালের ব্যবহার তাঁর জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বী এই প্রবীণ জেলের জীবনে এখন নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। মাছ ধরে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর ছয় সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
ওই জেলে জানান, আগে নদীতে মাছ ধরে কোনো রকমে সংসার চালাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাঁর আয় অনেকটাই কমে গেছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু তরুণ রাতের আঁধারে নদীতে কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করছেন। এতে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ছে, যা নদীর মাছের বংশবিস্তার ও জলজ সম্পদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে এই নদীতে মাছ ধরে আসছি। আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। তখন মাছের দাম কম ছিল, কিন্তু মাছের অভাব ছিল না। এখন মাছের দাম বেশি হলেও নদীতে মাছ পাই না। অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে আমাদের মতো পুরোনো জেলেদের জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমার ছয়টি ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। আগে কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। এখন নদীতে মাছ ধরেও সংসারের প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না।
প্রবীণ এই জেলের অভিযোগ, মুকসুদপুরের নতুন বাজার এলাকা থেকে উজানী পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে ব্যাটারিচালিত সরঞ্জাম ও নিষিদ্ধ জালের মাধ্যমে মাছ ধরার অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে নদীর মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জেলেরা।
তাঁর দাবি, রাতের বেলায় মাছ শিকারের পর সকালে নদীতে মৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত মাছ ভেসে থাকতে দেখা যায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।
নদীর সম্পদ রক্ষায় অভিযান ও নজরদারির দাবি
দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা এই প্রবীণ জেলে নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁর মতে, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা গেলে নদীতে মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি তাঁর মতো দরিদ্র ও অসহায় জেলেদের জীবিকাও কিছুটা সুরক্ষিত হতে পারে।
এলাকাবাসীরও দাবি, কুমার নদে অবৈধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকারের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হোক। মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করা হলে নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
একসময় যে নদী ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন, আজ সেই নদীতেই মাছের সংকটে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর ভবিষ্যৎ। জীবনের ৫২টি বছর নদীতে মাছ ধরে কাটিয়ে দেওয়া এই প্রবীণ জেলের এখন একটাই প্রত্যাশা,নদীতে মাছ ফিরুক, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ হোক এবং তাঁর মতো সাধারণ জেলেরা যেন আবারও সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 



















