উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার ড. ভূপেন হাজারিকার গাওয়া কালজয়ী ও মানবিক গান, মানুষ মানুষের জন্যে জীবন জীবনের জন্যে একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়নোই হলো মানবধর্ম। আর এমনই মানবতার দায়ে নেত্রকোণার চার এতিম নাতি-নাতনিসহ অসহায় ৮৫ বছর বয়সী রুস্তম আলীর পাশে দাঁড়ালো উপজেলা প্রশাসন
‘বাবা, আমি মনে হয় আর বাঁচবো না; আমি মারা গেলে আমার বাচ্চাদের দেখে রেখো’ মৃত্যুর আগে বৃদ্ধ বাবার হাত ধরে শেষ নিঃশ্বাসের আগে এ কথাই বলে গিয়েছিলেন কাঠমিস্ত্রি সুজন মিয়া।
স্ট্রোক করে সুজন মিয়ার আকস্মিক মৃত্যুর কিছুদিন পরই স্বামীর শোকে মারা যান তার স্ত্রী শিরিন আক্তার। আর তার কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান শিশুদের দাদিও।
একে একে আপনজনদের হারিয়ে এ পৃথিবীর সব আলো যেন নিভে গেছে অবুঝ চার ভাই-বোন—জিহাদ, সাথী, সিথী ও ইতির জীবনে।
বাবা-মা হারা এতিম শিশুগুলোর একমাত্র মাথার ছাদ এখন ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ দাদা রুস্তম আলী। চরম অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করা এ অসহায় পরিবারটির পাশে অবশেষে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নেত্রকোণা সদর উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরের ব্যবধানে একমাত্র ছেলে সুজন মিয়া, পুত্রবধূ শিরিন আক্তার ও স্ত্রীকে হারিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন রুস্তম আলী। যে বয়সে নিজের একটু পরিচর্যা ও বিশ্রামের প্রয়োজন, সে বয়সে ৪ অবুঝ নাতি-নাতনির অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার ভারী বোঝা এসে ভর করে তার জীর্ণ কাঁধে। অতীতে তিনি বাঁশ বেতের বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালালেও বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর কোনো কাজ করার সামর্থ্য নেই তার। কোনো নিয়মিত আয় না থাকায় চার শিশুর খাবার ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে প্রতিদিন এক নিদারুণ সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল তাকে। চরম এই দুর্দিনে স্থানীয় গ্রামবাসী সাধ্যমতো এগিয়ে এসে পরিবারটিকে সহায়তা করে আসছিলেন।
পরিবারটির খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় নাতি জিহাদ শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী; বাড়ির পাশের লক্ষীগঞ্জ বাজারে ঘুরে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে সামান্য সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কোনোমতে দিন কাটে তার। বড় মেয়ে সাথী (১৩) স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে (রোল-৬); চরম অভাবের মাঝেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ছোট বোনদের আগলে রাখার চেষ্টা করছে। মেজো মেয়ে সিথী এবং সবার ছোট ইতি (৪), বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে ইতি নানার বাড়িতে রয়েছে।
এতিম পরিবারটির এই মর্মস্পর্শী দুরবস্থার খবর স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পারেন শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী আশরাফুল আলম সানি।
পরবর্তীতে তিনি রুস্তম আলীর বাড়িতে গিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বিষয়টি নেত্রকোণা সদর উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে গতকাল রোববার সন্ধ্যার দিকে আমতলা ইউনিয়নের শিবপ্রসাদপুর গ্রামে রুস্তম আলীর নিজ বাড়িতে ছুটে যান নেত্রকোণা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিজা খাতুন। এ সময় তিনি বৃদ্ধ রুস্তম আলী ও তার নাতি-নাতনিদের হাতে খাদ্যসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। একই সঙ্গে পরিবারটির দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও স্বাবলম্বী করার আশ্বাস দেন তিনি।
এ বিষয়ে নেত্রকোণা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাতুন বাসসকে বলেন, ‘আজকে আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসলে কিছু খাদ্য প্যাকেট নিয়ে আসছিলাম উনাদের জন্য। উনি ইতোমধ্যেই বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন এবং উনার যে প্রতিবন্ধী নাতি রয়েছে সেও প্রতিবন্ধী ভাতাও পাচ্ছে। আমি ওনাদেরকে একটা প্রস্তাবনা দিয়েছি যে, আমাদের সরকারি শিশু পরিবারের পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে তাদের, যদি উনারা সম্মত হন এবং ওনারা যদি আমাদের প্রস্তাবনা বিবেচনা করেন, তাহলে মেয়ে শিশুদের জন্য আমরা সরকারি শিশু পরিবারে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারি।
তিনি বলেন, উনি যেহেতু বয়স্ক, তাই উনার জন্য আমরা প্রতিমাসের ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক একটা সহযোগিতা দেওয়া যায় কিনা তা বিবেচনা করব। আর ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য যেকোনো সোশ্যাল সেফটিনেট প্রোগ্রামের আওতায় উনাদেরকে যতদূর সম্ভব, তা সবসময় আমরা রাখার চেষ্টা করব যাতে উনি সচ্ছলভাবে চলতে পারেন।’
প্রশাসনের এমন দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। জীবনের সায়াহ্নে এসে নাতি-নাতনিদের নিরাপদ ভবিষ্যতের এমন আশ্বাস পেয়ে অশ্রুসজল চোখে প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বৃদ্ধ রুস্তম আলী। একই সঙ্গে, এতিম শিশুগুলোর স্বপ্ন ও নিরাপদ শৈশব সুনিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক হৃদয়ের মানুষদেরও এই পরিবারের পাশে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রিন্ট
সিটিজেন নিউজ ডেস্ক 


















